13 Sep 2015

শিক্ষকদের কোন্দলে বিপর্যস্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

font size decrease font size decrease font size increase font size increase font size

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের কোন্দল এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে এগুলোর কার্যক্রম বিপর্যন্ত হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও বেড়েছে।

বাংলাদেশের উত্তরপূর্বে সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একদল শিক্ষক উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছেন। উপাচার্যের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন আরেক দল শিক্ষক।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত হিসেবে পরিচিত শিক্ষকরাই এই দুই ভাগে ভাগ হয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এর আগে ছাত্রলীগের দু’টি গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে দীর্ঘসময় ক্লাস বন্ধ ছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে আরও কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও অচল হয়ে পড়েছিল শিক্ষকদের উপাচার্য হঠানোর আন্দোলনের কারণে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকদের অনেকে বলেছেন, শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতিতে দলীয় প্রভাব বৃদ্ধি এবং ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে এ ধরণের পরিস্থিতি হচ্ছে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে, তাদের মধ্যে এক ধরণের হতাশা তৈরি হয়েছে। তাদের কয়েকজনের সাথে ক্যাম্পাসে কথা হয়।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেছেন,তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থির একটা পরিবেশ সবসময় থাকছে।যার প্রভাব সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপরই পড়ছে এবং সেশনজটের কারণে তারা পিছিয়ে পড়ছেন।

একজন শিক্ষার্থী বলেছেন,তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও সেখানে ভর্তি হননি।কিন্তু শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে এখন তিনি দেড় বছরের সেশনজটে পড়েছেন।

তার বন্ধুরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন, তারা এগিয়ে গেছেন।উপাচার্য নিয়ে শিক্ষকদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান এই শিক্ষার্থীকে পীড়া দেয়।যদিও শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষকরা বলছেন, প্রতিকী কর্মবিরতির কর্মসূচি নিলেও তারা পরীক্ষা এবং ক্লাস চালু রেখেছেন। গত ৩০শে অগাস্ট তারা উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে মিছিল এবং অবস্থান কর্মসূচি নেন।

সেই কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের একদল কর্মী হামলা করলে ক্যাম্পাসে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উপাচার্য ছাত্রলীগের কর্মিদের ব্যবহার করছেন, এমন অভিযোগ তুলে আন্দোলনকারী শিক্ষকরা কর্মবিরতির মতো কর্মসূচি নেন।

এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়ে অপর অংশের শিক্ষকরা প্রশ্ন তুলেছেন।তবে আন্দোলনকারী শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম ড: জাফর ইকবাল বলেছেন, দলীয় রাজনীতি থেকে শিক্ষকরা এই আন্দোলন করছেন না।

তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, “যদিও এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি সরকারে রয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিক্ষকরাই এই আন্দোলন করছেন।ফলে এই আন্দোলন কোনো দলীয় রাজনীতির আন্দোলন নয়।”

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে পরিচিত শিক্ষকরাই বিভক্ত হয়ে উপাচার্যের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।এর প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতির ওপরও পড়েছে।আওয়ামী লীগ সমর্থক শিক্ষকরাই সমিতির নেতৃত্বে রয়েছেন।

এখন শিক্ষক সমিতির সভাপতি অবস্থান নিয়েছেন উপাচার্যের পক্ষে। আর আন্দোলনকারীদের সাথে রয়েছেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক।

এই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থক ছাত্রলীগ ও বামপন্থী ছোট কয়েকটি সংগঠন ছাড়া বিএনপি সমর্থক বা অন্য কোন ছাত্র সংগঠনের প্রকাশ্য তৎপরতা নেই।বিএনপি এবং জামায়াত সমর্থক শিক্ষকদের ফোরামও সক্রিয় নয়।

এবার পরিস্থিতির সুযোগে এই ফোরামের শিক্ষকরা দীর্ঘসময় পর তাদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন সংবাদ সম্মেলন করে।

এই ফোরামের নেতা অধ্যাপক কামাল আহমেদ চৌধুরী বলেছেন, তিনি একটি রাজনৈতিক ফোরামের নেতা হলেও শিক্ষকদের গোষ্ঠী স্বার্থ বা দলাদলি থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। তাঁরা ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ এবং শান্তি চান বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে আন্দোলনকারী শিক্ষকদের মধ্যে ৩৭জন শিক্ষক প্রশাসনিক বিভিন্ন পদে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন চারমাস আগে।এই প্রেক্ষাপটে পাল্টা বক্তব্য তুলে ধরছেন উপাচার্য আমিনুল হক ভূঁইয়া। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, ড: জাফর ইকবালের স্ত্রী এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড: ইয়াসমিন হক একদল শিক্ষক নিয়ে তাঁর সাথে কথা বলতে এসেছিলেন।

সে সময় সামান্য ভুল-বোঝাবুঝি থেকে অন্য রকম পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে বলে উপাচার্য দাবি করেছেন।

তবে সরকার কোন ব্যবস্থা না নিলে তিনি আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করবেন না বলেও জানিয়েছেন।সরকার যেনো ঘটনা তদন্ত করে, সেই বক্তব্যও তিনি তুলে ধরছেন।অবশ্য পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা বা তদন্তের কোন উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

শাহজালাল বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণে দু’জন উপাচার্যকে সরে যেতে হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একজন উপাচার্য চার বছর পুরো মেয়াদ ছিলেন।এরপর দু’বছর আগে এখনকার উপাচার্য নিয়োগ পেয়েছেন।আগে উপাচার্য হটানোর আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক আখতারুল ইসলাম।

তিনি মনে করেন, শিক্ষক হিসেবে তাদের সেই আন্দোলন সঠিক ছিল না বলে এখন উপলব্ধি করেন।এমন উপলব্ধির কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, তাদের আন্দোলন সফল হলেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল শিক্ষার্থীদের ওপর।

এরআগে আরও কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও অচলাবস্থা দেখা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ সমর্থক শিক্ষকদের উপদলের উপাচার্য হঠাও আন্দোলনের কারণে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে বড় উদাহরণ হিসেবে দেখানো যায়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড: আনোয়ার হোসেনকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য করা হয়েছিল।

তাঁর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সমর্থক শিক্ষকদেরই একটি অংশের আন্দোলনের একপর্যায়ে তাঁকে বাসভবন আটকেও রাখা হয়েছিল।শেষ পর্যন্ত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে ড: আনোয়ার হোসেনকে বিদায় নিতে হয়েছিল।

রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একই পরিস্থিতি হয়েছিল। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণেও বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়েছিল।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, গোষ্ঠী স্বার্থ থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ ধরণের পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে।

তিনি বলেছেন, “যেখানে বিরোধ হচ্ছে, সেখানে উপাচার্য এবং তার বিরোধীতাকারীরা একই রাজনৈতিক ধারার মানুষ বলে দেখা যাচ্ছে।একই দলের মধ্যে এই বিরোধকে উপদলীয় বিরোধ হিসেবেই আমি বলবো। মতাদর্শ থেকে এই বিরোধ হচ্ছে না।এটা গোষ্ঠী স্বার্থ থেকে হচ্ছে” বলে আমি মনে করি।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান দেখছেন ভিন্নভাবে। তিনি মনে করেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বেড়েছে। সে কারণে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ সামনে আসছে।

কয়েক দশক ধরে যখন যে দল সরকারে থাকছে, তাদের সমর্থক ছাত্র সংগঠন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে।

এখন যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যগুলোতে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থক ছাত্রসংগঠন কর্মকাণ্ডই চালাতে পারছে না। ফলে ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণকারী ছাত্র সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগে টেন্ডার-বাজি, চাঁদাবাজির জন্য কোন্দল থেকে অনেক সময় সংঘর্ষ এবং রক্তপাত পর্যন্ত হচ্ছে। শিক্ষক রাজনীতির ক্ষেত্রেও নানান অভিযোগ উঠছে।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, ক্ষমতার রাজনীতির কারণে আদর্শ থেকে যখন বিচ্যুতি ঘটছে, তখন পরিবেশটা পাল্টে যাচ্ছে

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই মনে করেন, উদ্বেগের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষকদেরকেই সুস্থ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তখন ছাত্র রাজনীতির ওপর তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তাঁরা এও বলেছেন,বড় রাজনৈতিক দলগুলোকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

Rate this item
(0 votes)

সর্বাধিক পঠিত