01 Jan 2014

মরা দায়ী নই

font size decrease font size decrease font size increase font size increase font size

রথম আলোর একটা বিজ্ঞাপন এখন বেশ জনপ্রিয়, যেটির শেষে বলা হয় ''যতদিন তোমাদের হাতে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ''।


এই বিজ্ঞাপনটিকে এবার কিছুটা স্যাটেয়ার করে ফেসবুকে একটা ছবি চোখে পড়ছে, যেখানে শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, এরশাদ এবং মতিউর রহমান নিজামীর ছবি দিয়ে তার নিচে লেখা হয়েছে, ''যতদিন এদের হাতে দেশ, পথ পাবে না বাংলাদেশ''।

বাংলাদেশ কি আসলেই পথ হারিয়েছে? রাষ্ট্র কখনো পথ হারায় না। কিন্তু যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তা হোক সরকার, বিরোধী দল, উপবিরোধী দল কিংবা প্রশাসন অথবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং সশস্ত্র বাহিনী- রাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বা একাধিক কিংবা সবগুলো যখন পথ হারায়, তখন রাষ্ট্রও পথ হারাতে বাধ্য। বাংলাদেশ নামে মাঝ বয়সী রাষ্ট্রটির এখন সেই দশা। পঞ্চাশ পেরোনোর আগেই তার উপর একের পর এক এমন সব মানবসৃষ্ট ঝড় বয়ে যাচ্ছে, যার ফলে এখন অনেকটা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বাংলা নামের এই দেশটি। অথচ তার জন্ম হয়েছিল তিরিশ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে। কিন্তু জন্মের ৪২ বছরেও  তার সেই রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছে না।  

দেশে এখন যা চলছে, তার জন্য দায়ী কে? দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে বলতে পারি, এই পরিস্থিতির জন্য আমি দায়ী নই। যারা এই লেখা পড়ছেন, তারাও দায়ী নন। দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে অন্তত  পৌনে ১৬ কোটি মানুষ এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী নন, এটা বলা যায়। তাহলে দায়ী কে বা কারা?

এই পরিস্থিতির জন্য অবশ্যই দায়ী প্রধানত দুজন, একজন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অন্যজন বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া। এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী জামায়াত। তাদের সঙ্গে আরও দায়ী এই তিনটি দলের নেতারা।

আরও পরিষ্কার করে বললে, দেশে এখন যে প্রতিদিন নিরীহ মানুষ খুন হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য খুন হচ্ছে, নিরপরাধ মানুষ আগুনে পুড়ে মরছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে, তার জন্য প্রধানত দায়ী দেশের প্রধান দুই নেত্রীর ইগো, এ দুটি দলের নেতাদের সীমাহীন লোভ এবং সর্বোপরী যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতের মরণ কামড়।

জামায়াত এখন বিএনপির মাথায় লবণ রেখে বড়ই খাওয়ার চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করছে। জামায়াতকে এই সুযোগটি করে দেয়ার পেছনেও সরকার তার দায় এড়াতে পারে না।

কেননা, যে দলটির দেশে এক শতাংশ জনসমর্থন নেই, এক শতাংশ ভোট নেই, মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি বিরোধিতাকারী এবং গণহত্যায় নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগ যে দলটির বিরুদ্ধে, সেই দলটিকে নিষিদ্ধ করার বদলে দেশের প্রধান দুটি দলই নিজেদের স্বার্থে বারবার কাছে টেনেছে এবং দেশের মূলধারার রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ছিয়ানব্বইয়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের আন্দোলনের একটা বড় শক্তি ছিল জামায়াত । জামায়াতের দুর্ভাগ্য যে, সেই আওয়ামী লীগের আমলেই তাদের দলের নেতারা ফাঁসিতে ঝুলছে। আর রাজপথে আওয়ামী লীগকে মোকাবেলা করার ক্ষমতা যেহেতু ভোগবাদী বিএনপি নেতাদের নেই, তাই তারা সাথে নিয়েছে জামায়াতকে এবং চলমান নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের পুরো নেতৃত্ব এখন জামায়াতের হাতে এবং জামায়াত এই আন্দোলনের পুরো ফসলই তাদের ঘরে তোলার চূড়ান্ত আয়োজনে ব্যস্ত। নির্দলীয় সরকারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের মোড়কে জামায়াত এখন যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত তাদের দলের নেতাদের বিচার প্রক্রিয়া বানচালের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। সুতরাং এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সারা দেশে চলমান বিরোধী জোটের আন্দোলন এখন কার্যত জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে।

সরকাপন্থিরা প্রশ্ন করবেন, এই সংকট ও সহিংসতায় সরকারের দায় কী? সাদাচোখে আমরা এই সংকটের সূত্রপাত দেখি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে, যেখানে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। আর এটিই বিরোধী দল আন্দোলনের প্রধান ইস্যুতে পরিণত করে। কেননা, সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যস্থা বাতিল না করলে এবং নির্বাচনকালীন একটি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা চালু করলে বিএনপি আন্দোলনের কোনো ইস্যু খুঁজে পেত না। সরকার যদিও দাবি করে যে, বিএনপির আন্দোলন যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য, সেটি হয়তো অনেকাংশে সত্য। কিন্তু এটিই মূল কারণ নয়। বিএনপির আন্দোলনের মূল কারণ শেখ হাসিনার অধীনে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে আগামীতে ক্ষমতায় যেতে না পারার আশংকা।

সংবিধানে যদি নির্বাচনকালীন একটা নির্দলীয় সরকারব্যস্থা থাকত, তাহলে বিএনপি এই বলে আন্দোলনের সুযোগ পেত না যে, ''আমরা যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি চাই বা এই বিচার বন্ধ করা হোক''। কারণ, এই কথা বলে বিএনপি যদি আন্দোলন শুরু করত, জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করত। কিন্তু এখন বিএনপি যেই দাবিতে আন্দোলন করছে, সেই আন্দোলনের ধ্বংসযজ্ঞ ও সহিংসতাকে দেশের মানুষ ঘৃণা করলেও বিএনপির দাবির সঙ্গে অধিকাংশ মানুষ একমত। কারণ, দেশের অধিকাংশ মানুষই মনে করেন, যতদিন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি না হবে, যতদিন পর্যন্ত নির্বাচন বর্জনের সংস্কৃতি দূর না হবে, যতদিন পর্যন্ত না একটা শক্তিশালী এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করা সম্ভব হবে, ততদিন নির্বাচনকালীন একটা নিরপেক্ষ সরকার থাকতে হবে। সে হিসেবে বিএনপির নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবির সঙ্গে দেশের অধিকাংশ মানুষ একমত, এটি বোঝার জন্য কোনো জরিপ না করলেও চলে।

তার মানে চলমান সংকটের সূচনা করেছে সরকার, এক্ষেত্রে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল সম্পর্কিত আদালতের রায়ের যে যুক্তি দিয়েছে, তাও ধোপে টেকে না। এ নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে।

সুতরাং, দেশের মানুষ এখন সংকট সৃষ্টির জন্য সরকারের ওপর যেমন ক্ষুব্ধ, তেমনি আন্দোলনের নামে সারা দেশে ধ্বংসযজ্ঞ ও সহিংসতা চালানোর জন্য বিরোধী জোটের ওপর আরও বেশি ক্ষুব্ধ। মানুষ এখন এই স্বেচ্ছাচারিতা ও ধ্বংসযজ্ঞ থেকে মুক্তি চায়। কিন্তু তাদের সেই মুক্তি কে দেবে? জনগণ নিজেরাই কি সেই মুক্তির পথ খুঁজে নেবে?

আমীন আল রশীদ:লেখক ও সাংবাদিক

 

 

 

Rate this item
(0 votes)

সর্বাধিক পঠিত

গোবিন্দগঞ্জে প্রতিপক্ষের

গাইবান্ধা প্রতিনিধি :: প্রতিপক্ষের হামলায় নারীর গর্ভের

Read more

তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ কি আসন্ন!

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তৃতীয় আরেকটি যুদ্ধ কি আসন্ন?

Read more

শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের পাওয়া

জেনেভা ক্যাম্পে শীর্ষ ও তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের পাওয়া

Read more

যে আমল করলে আল্লাহর ইচ্ছাতে

যে দোয়ার আমল করলে – নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

Read more

কুরআন বুঝার চেষ্টা করি।

পৃথিবীতে সবচেয়ে পরিশ্রমী পতঙ্গ হলো পিঁপড়া। তারপরে কে?

Read more

JPL DOOR & FURNITURE IND.

প্রতিষ্ঠিত ফার্নিচার কোম্পানীর জন্য দুইজন সচ্ছল

Read more

JPL DOOR & FURNITURE IND.

সমকামী নাটক প্রচার করে তোপের

 

 

 

ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে সমকামীদের অধিকার নিয়ে মোবাইল

Read more

ব্রেকিং নিউজঃ- নিন্দা ও

ব্রেকিং নিউজঃ- নিন্দা ও একাত্ততা প্রকাশ।

Read more